বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনা ও আমাদের ভবিষ্যৎ

অফশোর গ্যাসকে ঘিরে নতুন ভাবনার প্রয়োজন

নাজমুল আহসান

বাংলাদেশের জ্বালানি গল্প এখন এক নতুন অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে। বছরের পর বছর ধরে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো যে প্রাচুর্য দেখিয়েছে, তা আজ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। শিল্পের চাহিদা বাড়ছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ বাড়ছে, আর আমদানিকৃত LNG—যার দামে কখনো সাগর শান্ত, কখনো উত্তাল—মুদ্রার ভাণ্ডারে বাড়তি চাপ ফেলছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন

কিন্তু এই অনিশ্চয়তার মাঝেই রয়েছে এক নিভৃত সম্ভাবনার দ্বীপ। উপকূলরেখার বাইরে, অবারিত সাগরের বুকে, অন্ধকারের মতো গভীর অজানা এক ভূগর্ভ—বঙ্গোপসাগরের অফশোর অঞ্চল। বহুদিন ধরে যার গল্প আমরা শুনেছি, কিন্তু যার মানচিত্র আজও অপূর্ণ রেখাচিত্রে আঁকাবাঁকা।

অদেখা সম্ভাবনার মানচিত্র

২০১৭ সালের ব্লক ম্যাপে যে অফশোর ব্লকগুলো দেখানো আছে—অগভীর থেকে গভীর সমুদ্রে বিস্তৃত—সেগুলোর অনেক এলাকায় আজও নেই পর্যাপ্ত সিসমিক ডেটা। যেন সমুদ্রের বুকের নিচে জেগে থাকা কোনো গোপন অধ্যায়, যা এখনো পাঠোদ্ধারের অপেক্ষায়।

LNG নির্ভরতার খরচ: এক অনিশ্চিত উপকথা

বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রায় ৯০০ এমএমসিএফডি LNG রি-গ্যাসিফাই করে। এই সংখ্যা আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে। এর মানে—

  • প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাগরে মিলিয়ে যাওয়া

  • বিদ্যুতের ব্যয় বাড়া

  • শিল্পের উপর অনিশ্চয়তার ছায়া

  • বৈশ্বিক অস্থিরতায় হঠাৎ বিপর্যয়ের ঝুঁকি

আমাদের অর্থনীতির জন্য LNG এক প্রয়োজনীয় নদী—কিন্তু যার পানি কখনো আয়েশী স্রোত, কখনো বন্যার মতো আক্রমণাত্মক।

তাই অফশোর গ্যাস কোনো ঐচ্ছিক অধ্যায় নয়—এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

২০২৪ সালের বিড রাউন্ড: নীরবতার বার্তা

বাংলাদেশ যখন নতুন PSC প্রকাশ করলো, নতুন করে বিড রাউন্ড ঘোষণা করলো—অনেকে ভেবেছিল, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখাবে। কিন্তু ফলাফল ছিল নিস্তব্ধ। কেউ এল না।
এ নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল সংকেত—
ডেটা নেই, আস্থা নেই, তাই বিনিয়োগও নেই।

সমুদ্রের গভীরতা নয়, সমস্যা আমাদের পৃষ্ঠে

  • আধুনিক সিসমিক ডেটার অভাব

  • ফ্রন্টিয়ার বেসিন হিসেবে ঝুঁকি

  • PSC–এর সীমাবদ্ধতা

  • আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যথেষ্ট প্রচার না পাওয়া

সব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগর এখনো ‘সুযোগের দেশ’ নয়—বরং ‘অজানার দেশ’ হিসেবেই রয়ে গেছে।

তিনটি পথ—যেদিকে গেলে গল্পের মোড় ঘুরবে

১. চুক্তির কাঠামোয় নতুন ভাষা

গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে PSC আরও নমনীয়, আরও বিনিয়োগবান্ধব হতে হবে।
গ্যাসমূল্যকে বৈশ্বিক সূচকের সাথে যুক্ত করা—আজকের বাস্তবতা।

২. অগভীর জলে নতুন চুক্তি: Revenue Sharing

সরল, স্বচ্ছ আর দ্রুত কার্যকর হওয়ায় অনেক দেশেই এটি সফল হয়েছে।
সমুদ্রের অগভীরতা যেন কাগজের জটিলতায় ডুবে না যায়।

৩. সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার—সিসমিক জরিপ

সমুদ্রের নিচে কী আছে—এ প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর না পেলে কোনো কোম্পানি বিলিয়ন ডলার নিয়ে আসবে না।
সিসমিক ডেটা যেন সমুদ্রের মানচিত্র—এটি ছাড়া নৌকা নদীর পথও হারায়।

উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকা

GIZ, বিশ্বব্যাংক, NORAD—অনেকেই সাহায্য করতে পারে—
সিসমিক জরিপে কো-ফাইন্যান্সিং থেকে শুরু করে আধুনিক চুক্তি মডেল প্রণয়ন পর্যন্ত।

ছয়টি জরুরি করণীয়

১. নতুন সিসমিক রিপোর্ট দ্রুত প্রকাশ
২. অতিরিক্ত 2D/3D জরিপ অনুমোদন
৩. গভীর সমুদ্রের PSC আরও শক্তিশালী করা
৪. অগভীর জলে RSC চালু
৫. একক-জানালা অনুমোদন ব্যবস্থা
৬. অফশোর উন্নয়ন ও প্রচারের জন্য বিশেষ সেল

বঙ্গোপসাগরের নিচে কী লুকিয়ে আছে—তা আজও আমরা জানি না। কিন্তু জানি—
যদি এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, তাহলে গ্যাস নয়, আলোও উঠতে পারে সমুদ্রের গভীর থেকে।

বাংলাদেশের জ্বালানি গল্পের পরবর্তী অধ্যায়টি এখনো লেখা হয়নি।
লেখা হবে কি না, তা নির্ভর করছে—
আমরা কি সাগরের ডাক শুনতে পাচ্ছি, নাকি শুধু তীরের ঢেউয়ে ব্যস্ত?

- Advertisement -

এই বিভাগের আরও সংবাদ