“এক তরফা ভালোবাসা পর্ব ২

সুমাইয়া জান্নাত প্রেমা

পর্ব ২: রাতের বৃষ্টি আর এক অজানা কণ্ঠ

রাত প্রায় সাড়ে দশটা। “সন্তানহীন শান্তিনিকেতন” বৃদ্ধাশ্রমের চারদিক নিস্তব্ধ। বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছে। টিনের ছাউনি বেয়ে টুপটাপ শব্দ—যেন পুরনো স্মৃতির মতো ঝরে পড়ছে একটার পর একটা।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন

নায়লা সেদিন বৃদ্ধাশ্রমেই থেকে গেছে। সকালে ঢাকায় ফেরার কথা ছিল, কিন্তু আজকের বৃষ্টিটা তার মনে অদ্ভুত টান জাগিয়েছে। মনে হচ্ছে, এখানে কিছু একটা ঘটবে।

সে ছাদে উঠে এলো। বৃষ্টির হাওয়া তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। চোখের কোণে জমছে জল—তবে সেটা শুধু বৃষ্টির নয়, কিছু অজানা ব্যথাও মিশে আছে তাতে।

হঠাৎ নিচের বারান্দা থেকে কারও কান্নার শব্দ ভেসে এলো।

নায়লা দ্রুত নিচে নেমে এলো। দেখে, নতুন আসা এক বৃদ্ধ—সিরাজুল হক। বয়স প্রায় ৭৫। একসময় রেলওয়ের কর্মকর্তা ছিলেন। এখন চোখে জল, হাতে একটি পুরনো চিঠি।

নায়লা এগিয়ে গিয়ে বলল,
— “দাদা, কী হয়েছে?”

বৃদ্ধের গলা কাঁপছে।
— “চিঠিটা আমার স্ত্রীর লেখা। বহু বছর আগে মারা গেছে। আজ হঠাৎ বৃষ্টির মধ্যে আলমারির নিচ থেকে চিঠিটা পেলাম। মনে হয়, আল্লাহ আজও চান আমি যেন তাকে ভুলে না যাই।”

নায়লা চিঠিটা হাতে নিল। তাতে লেখা—

“সিরাজ, যদি কোনোদিন আমার চিঠি তোমার হাতে পড়ে, জেনো—মৃত্যুর পরও আমি তোমার অপেক্ষায় আছি। তোমার একাকিত্ব বাতাসের সঙ্গে আমার কাছে পৌঁছে যাবে…”

নায়লা নিঃশব্দে চিঠিটা ভাঁজ করল। বৃদ্ধের কাঁধে হাত রাখল। তখনই সে অনুভব করল—তার ভেতরেও একটি ফাঁকা জায়গা আছে। সেখানে কেউ নেই, শুধু ভালোবাসা জমে আছে, প্রকাশের সুযোগ ছাড়া।

পরদিন সকালে বৃদ্ধাশ্রমে এল নতুন একজন মানুষ।

উঁচু দেহ, ফর্সা গাত্রবর্ণ, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। নাম—আরিয়ান ইসলাম। পেশায় ফটোজার্নালিস্ট। বৃদ্ধাশ্রমের জীবন নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি বানাতে এসেছে।

নায়লা ও আরিয়ানের প্রথম দেখা লাইব্রেরির পাশে। নায়লা থিসিসের নোট লিখছে, আরিয়ান জানালার পাশে ক্যামেরা সেট করছে।

— “মাফ করবেন, আপনি কি এখানকার সদস্য, নাকি গবেষক?”
নায়লা হেসে বলল,
— “গবেষক। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী। আপনি?”
— “আমি জীবনের গল্প খুঁজি ছবিতে। এখানকার চোখের ভেতর লুকানো গল্পগুলোই আমার ফ্রেম।”

নায়লা চুপ করে রইল। তার মনে হলো, এই মানুষটা অন্যরকম। চোখে এক গভীরতা—যেন অনেক কিছু দেখেছে, হারিয়েছে।

সেদিন তারা অনেক কথা বলল—বৃদ্ধদের গল্প, সমাজ, একাকিত্ব, ভালোবাসা নিয়ে।

কিন্তু নায়লা বুঝতে পারল না—আরিয়ান শুধু বৃদ্ধদের নয়, তার মধ্যেও কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে।

রাত নামল আবার। বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু বাতাসে ঠান্ডা শিহরণ। নায়লা বারান্দায় বসে গরম চা খাচ্ছিল। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে দূর থেকে শোনা গেল এক পুরুষ কণ্ঠের কান্না।

নায়লা উঠে দাঁড়াল।

শব্দটা আসছে বৃদ্ধাশ্রমের পেছনের পুরনো ঘর থেকে। একসময় ওটা বাসিন্দাদের রুম ছিল, এখন খালি পড়ে আছে।

টর্চ হাতে এগিয়ে গেল নায়লা। দরজা আধখোলা। ভেতরে ঢুকতেই বাতাস অস্বাভাবিক ঠান্ডা লাগল।

ঘরের কোণে একটি পুরনো ফটোফ্রেম।

ভেতরে এক তরুণী, হাসছে।

নিচে লেখা—
“আমার নাম লায়লা।”

নায়লা থমকে গেল।

লায়লা! নামটা অদ্ভুত মিল—নায়লা আর লায়লা।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “ওটা এখানে রাখা আছে পনেরো বছর ধরে।”

নায়লা ঘুরে তাকাল।

আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে।

তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু ভারী।
— “লায়লা ছিল আমার মা। এই বৃদ্ধাশ্রমেই মারা গিয়েছিল।”

নায়লা হতবাক।
— “তোমার মা?”

আরিয়ান মাথা নিচু করল।
— “আমি তখন ছোট। বাবা মা’কে এখানে রেখে চলে গিয়েছিল। যখন বুঝেছি, তখন মা আর নেই।”

নায়লার বুক কেঁপে উঠল। এই প্রথম সে দেখল—একজন পুরুষের চোখে এমন কান্না, যা লুকানো যায় না, থামানোও যায় না।

নায়লা ধীরে বলল,
— “তুমি কি জানো, তোমার মা এখনও আছেন? যাদের জন্য ভালোবাসা নিয়ে মানুষের চোখে জল আসে, তারা কখনও মরে না।”

আরিয়ান তাকিয়ে বলল,
— “তুমি কি বিশ্বাস করো, ভালোবাসা টিকে থাকে?”

নায়লা উত্তর দিল না। জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।

বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে।

দুজনের মুখে নীরবতা—কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই জন্ম নিল এক ভালোবাসা, যার কোনো স্বীকৃতি নেই; যা শুধু অনুভব করা যায়, বলা যায় না।

- Advertisement -

এই বিভাগের আরও সংবাদ