“একাকিত্ব “
সুমাইয়া জান্নাত প্রেমা
পর্ব ১: নীরবতার নিঃশব্দ জন্ম।
রাতের নরম হাওয়া জানালার পর্দার নিচ দিয়ে ঢুকে ঘরে ছড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতর আলো বলতে শুধু একটা ছোট্ট টেবিল ল্যাম্প-তার আলোও যেন ক্লান্ত, স্লান,নিস্তেজ। এই আলোতে বসে আছে আরিয়ান,
চোখ দুটো তার বয়স অনুযায়ী বেশি গভীর ও অনুজ্জ্বল।
এ যেন ১৮ বছরের কোন ছেলে নয় —বরং বহু ঝড়ঝাপটা পার হয়ে আসা কোনো নিঃসঙ্গ মানুষ। বাইরে রাত অনেক হয়েছে। মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে,
অথচ রাত যেন আরিয়ানের সাথে কথা বলতে চায়। কারন একমাত্র রাতেই মানুষ নিজের আসল অনুভূতির কাছে আত্মসমর্পণ করে।
দিনে যারা স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে, রাতে তারা নিজেদের কাছে সত্যি হয়ে ওঠে।
আরিয়ানের টেবিলে একটা খাতা খোলা। পাতায় লেখা মাত্র একটা শব্দ —-
“একাকিত্ব ”
এ শব্দটা শুধু একটা অনুভূতি নয়,
বরং একটি নিঃশব্দ রোগের মতো,
যা বাহিরের কেউ দেখে না,
কেবল ভেতরে ভেতরে মানুষকে ধ্বংস করে ফেলে।
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
বুকে জমে থাকা ভার যেন একটু নেমে এলো—-
তবুও মনটা হালকা হলো না
দিনের পর দিন ওর মনে এমন সব প্রশ্ন জমা হচ্ছে যার উত্তর কেউ দেয় না।
বাবা বলেন, শক্ত হও,একটুতেই ভেঙে পড়ো কেন?
মা বলেন, অতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনা কেন করো?
কিন্তু কেউ একবারও বলেনি —কী এতো চিন্তা করো তুমি? কিসের এতো কষ্ট তোমার?
আসলে বাস্তবতা হলো, মানুষ ভালোবাসতে জানে, কিন্তু বোঝতে জানে না।
একসময় আরিয়ান খুব হাসিখুশি ছিল। বন্ধুদের মাঝে প্রাণ ছিল ও।কিন্তু ধীরে ধীরে বদলে গেল। বন্ধুরা ভাবে ও বদলে গেছে আচমকাই।
কিন্তু আসলে এটা কোনো হঠাৎ পরিবর্তন নয়– এটা জমতে থাকা এক একাকিত্বের বহু বছরের ফল।
মানুষ যখন মনে মনে ক্লান্ত হয়ে যায়, তখনই সে চুপ হয়ে যায়,হাসি কমে যায়, কথা কমে যায়, অভিযোগ কমে যায়।
একসময় মানুষ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে শব্দহীন ভাষায় একমাত্র ভাষা হয়ে ওঠে।
আজকের রাতটা আগের চেয়ে বেশি ভারী।বাইরের নীরবতা আর ভেতরের নীরবতা এক সঙ্গে মিলে একটা বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে।
ছাদের দিকে তাকিয়ে আরিয়ান ভাবছিল —
“মানুষ কি সত্যিই কাউকে বুঝতে পারে?
নাকি সবাই শুধু নিজেকে বুঝে? ”
এই প্রশ্নটা তার মনে বহু দিন ধরে ঘুরছে।
বন্ধুরা বলে,”সব ঠিক হয়ে যাবে। ”
কিন্তু কীভাবে ঠিক হবে তা কেউই বলে না।
পরিবার বলে,বেশি মন খারাপ করো না।
কিন্তু মন কীভাবে ঠিক রাখবে সেই উপায় তারা শেখায় না।
আরিয়ানের সমস্যা একটাই —-
ও সবকিছু খব গভীরভাবে অনুভব করে। মানুষের চোখে চোখ রেখে বুঝে ফেলে সে আসলে কি বলতে চাইছে বা বোঝাতে চাইছে।
কিন্তু যখন নিজের মনের কথা কাউকে বলতে চায় -তখন তার চারপাশে দেয়াল ওঠে যায়।
এখন সে প্রতিদিনের মতো নিজের ঘরেই একা।কিন্তু আজকের একাকিত্ব অন্য দিনের চেয়ে ভয়ংকর।
এটা সেই ধরনের নীরবতা
যা মানুষের মনকে অসাড় করে দেয়।
যেখানে কান্না ইচ্ছা করলেও আসে না।
যেখানে হাসি মনে হয় এক অচেনা শব্দ।
কিছুক্ষণ পরে,আরিয়ান বারান্দায় বের হলো।রাতের ঠান্ডা বাতাস।দূরে একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। পৃথিবী এতো বিশাল, তবুও আরিয়ান নিজেকে এক বিন্দুর মতো মনে করলো–যে বিন্দু কে কেউ খেয়াল করে না।হঠাৎ করে আরিয়ানের মাথায় আসলো,
জীবনে যত মানুষ এসেছে -সবাই কোনো না কোনো সময় চলে গিয়েছে।
কেউ বুঝতে চায় নি, কেউ চলে গেছে, কেউ শুধু নিজের পৃথিবীতেই ব্যস্ত ছিল।
মানুষের ব্যস্ততার ভীড়ে একজন মানুষের নীরব আর্তনাদ সবচেয়ে সহজে হারিয়ে যায়।
আরিয়ান ভাবছে,আমি কি সত্যিই এতোটা বোঝা?
নাকি আমি শুধু অনুভূতিতে বেশি সৎ।
মানুষ কখনো কখনো এতোটাই একা হয়ে যায় যে,সে তখন নিজের সঙ্গেই কথা বলা শুরু করে দেয়। সে তখন নিজের সঙ্গেই বিতর্ক করে।নিজের সঙ্গেই রাগ করে।আবার নিজের সঙ্গেই মানিয়ে নেয়।
একাকিত্বে কোনো অনুভূতি থাকে না–রয়ে যায় শুধু শক্ত হয়ে যাওয়া একটা মন,যা হাসতে জানে না,কাদঁতেও জানে না।
আজকের রাত হলো সেই রাত, যে রাতে আরিয়ান বুঝতে পারলো –অনুভূতিগুলো সে আর কাউকে বলতে পারবে না। কারণ মানুষ শোনে,কিন্তু বোঝে না।
আরিয়ানের চোখের সামনে একটা চিন্তা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে লাগলো —
এ পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন যাত্রা হলো নিজের মনের ভেতর দিয়ে হাঁটা।যেখানে আলো কম,অন্ধকার বেশি,আর পথ দেখানোর মতো কেউ নেই।
এই রাত——–
এই নীরবতা ———
এই নিঃশব্দ কান্না ———-
এই অসহায় বোধ ———-
সব মিলিয়ে আজ জন্ম নিলো আরিয়ানের জীবনের দীর্ঘতম যাত্রা।
একাকিত্বের যাত্রা।
এ যাত্রায় কেউ তার সঙ্গে হাটঁবে না। এই পথের বোঝা কেউ ভাগ করে নেবে না।এখানে সে একাই, যেন বিশাল পৃথিবীর মাঝে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট মানুষ।
কিন্তু এই রাত—
এই অধ্যায়ের শুরু —
এটাই বলে দিচ্ছিল—
এখনো যত কষ্ট এসেছে, তার থেকেও গভীর ও অন্ধকার সময় আরও সামনে অপেক্ষা করছে।
